Wednesday, September 5, 2018

ছোটগল্প ; স্যারের ভাঙ্গা চশমা

মোটামুটি একটা ভালো চশমা কিনতে হবে।জিনিসের দাম যেভাবে বেড়েছে ৮০ টাকার নিচেতো হবে না।আইডিয়া খারাপ ছিলো না।ভালো একটা মুরব্বিয়ানা চশমা কিনলাম স্যারের জন্য।দাম ৭০ টাকা।
এটা এখনকার কথা না।১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরের কথা।আমাদের বার্ষিক পরিক্ষার সময় ঘনিয়ে।সবাই যে যার পড়ায় ব্যস্ত। স্যার বলেছে:এবার অষ্টম শ্রেণীর বার্ষিক পরিক্ষা যদি কেউ পাশ না করে তাকে নবম শ্রেণীতে উঠানো হবে না।পাশ করার চিন্তা সবাই করলেও রাজিবের এ নিয়ে মাথা ব্যথা নেই।বছরের প্রথম থেকেই ও অন্যান্য সবার থেকে আলাদা।
যেদিন প্রথম ক্লাস শুরু হয় আমরা চিন্তা করতেছি আমাদের শ্রেণী শিক্ষক নিয়ে।মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন।জয় স্যার বলেই সবাই ডাকে।তবে আমাদের ক্লাসের সবাই তাকে ভাঙ্গা চশমা নামেই চেনে।গত দুই বছর আগে তার চশমাটা ভেঙ্গে যায়।সুতা দিতে কোনমতে আটকে স্কুলে বাজার সব জায়গায় তার চলাচল।আমরা প্রতিনিয়ত তার ভাঙ্গা চশমা নিয়ে কৌতুক তৈরী করি।সবার থেকে এ বিষয়ে বেশি পটু ছিলো নাসির।রাজিবের সাথে নাসিরের তাই ঝগড়াটে ভাব থাকতই। শীতের সময় যেমন কুয়াশা কাটতেই চায় না।প্রথমদিন রাজিব সরাসরি বলেও দিলো:
ভাই! তোমার সাথে কি আমার আগের শত্রুতা আছে।তুমি আমার গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে আসো ক্যানো।তুমি স্যারকে নিয়ে কৌতুক করেছো তাই আমি বাধা দিয়েছি।এতে অপরাধতো কিছু না।
অপরাধবোধটা তখন আমাদের মাঝেও উদয় হয়নি।আমাদের অবস্থান তাই রাজিবের বিরুদ্ধে।দুচোখে সহ্য করতে পারতাম না।
সবাই মিলে টিফিনের সময় বুদ্ধি করলাম কালকে ওকে সামান্য মজা দেখাবো।সবাই চুইনগাম চিবিয়ে ওর ব্যাগে লাগিয়ে রাখবো।ও দেখবে না কে করেছে।বিচারও হবে না।অন্যকেউ হলে অজ্ঞাত নামে বিচারটা স্যারকে দিয়েই দিতো।রাজিব দুনিয়ার কোন ঝামেলায় গেলো না।সরাসরি আল্লাহর কাছেই বিচার দিলো।মজলুমের শেষ আর্তনাদ প্রভুর দরবার।আল্লাহ কবুলও করলো।সেদিন ইংরেজি ক্লাসে আমরা কেউ পড়া পারলাম না।শুধু ও ঠোঁটস্ত বলে দিলো।নিয়ম অনুযায়ী এবার মার খেতে প্রস্তুত হলাম।কিন্তু সেদিন মনে হয় আমাদের মায়েরা লাউয়ের পাতা বিলিয়ে ছিলো।গ্রামে বড় ধরণের বিপদে কেউ উদ্ধার হলে সবাই বলে:তোর মা লাউয়ের পাতা বিলিয়েছে।তাই আজ বেঁচে গেলি।স্যারও বললেন:আজ তোরা বেঁচে গেলি।রাজিব মার দিতে নিষেধ করলো বিধেয় আজ দিলাম না।কাল কিন্তু সবাই পড়া শিখে আসবি।
জ্বী স্যার!  সবার পড়া আমি বানিয়ে দেবো।
রাজিবের এমন কথায় আমরা হো হো করে হেসেই দিলাম।কিন্তু সত্যি সত্যি ও আমাদের পড়া বানিয়ে ছাড়লো।সবার উদ্দেশ্য করে বললো:ইংরেজি সহজ। আসো আমরা নতুনভাবে এটা পড়ি।কৌতুকের মাঝে শব্দগুলো ডুকিয়ে দেই।নাসির তুমিই কিন্তু এটা ভালো পারবে।
নাসির যথারীতি কাজ শুরু করলো।আমরা কৌতুক শুনা মাত্রই পড়াও হয়ে গেলো।রাজিব হলো শত্রু থেকে আমাদের বন্ধু।
বন্ধুরা সবাই মিলে গ্রুপ করলাম।শত্রুমুক্ত বন্ধু গ্রুপ।আমাদের কাজ হলো বিদ্যালয়ের সৃজনশীল কাজ করা।প্রথম উদ্যোগে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করলাম।স্যারেরা আমাদের উপর অনেক খুশি।পুরস্কারও দিলেন জয় স্যারের হাত দিয়ে।পুরস্কারের টাকা দিতে আমরা বিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে মূল্যবান উক্তি সমৃদ্ধ কাগজ টানালাম।শান্তিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের চেহারাই আজ অন্য রকম।কিন্তু পুরানো একটা নাম রয়েই গেলো;ভাঙ্গা চশমা।
স্যারকে নিয়ে আমাদের ঠাট্টা তখন বেশ চলতো।স্যার না বেতনের টাকা কবরে নিয়ে যাবে।সেই জন্য খরচ করেন না।আরে না! স্যার তার বউরে স্বর্ণের গয়না বানিয়ে দেওয়ার জন্য টাকাগুলো জমাচ্ছে।তুইয়ো জানিস না,স্যার যখন বিয়ে করেছে তখন বউরে মহরানা দেয়নি।তাই টাকা জমিয়ে মহোরানা দিবে।হা হা হা।
হাসিতে হাসিতে আড্ডার মজলিশ আরোও গরম।রাজিব একদিন টিফিনে আমাদের আড্ডায় এলো।বললো :আজ লাইব্রেরি বন্ধ।পড়তে পারলাম না।তোদের সাথে গল্প করি।আমরা যথারীতি ভাঙ্গা চশমার মুরুব্বিয়ানা কথাগুলো নিয়ে রসিকতা শুরু করলাম।রাজিব আমাদের থামিয়ে দিলো।
তোরা কি জানিস,স্যার কি ভালোবাসেন আমাদের?
ভালোবাসে।না ছাই।শালা পুরা হারামি।
তোরা ভুল বুঝতেছিস।স্যার শুধু মাত্র আমাদের ভালোর জন্য ক্লাস মিস দেন না।অথচ তার ঘরে মেয়ে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে।ঠিকমতো চিকিৎসাও করাতে পারেন না টাকার অভাবে।স্যার কিন্তু স্কুল থেকে কোন বেতন নেন না।সেইজন্য দেখিস না স্যারের চশমাটা সুতোয় বাধা।
আমরা সবাই সবার দিকে চেয়ে রইলাম।রাজিব বললো:কিরে তোদের কি হয়েছে।একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে আছিস ক্যান।
নাসিরই মুখ খুললো।আমাদের সব অপরাধ সে স্বীকার করতে লাগলো।
রাজিব বললো:আমরা যেহেতু অপরাধ করেছি।এর প্রায়শ্চিত্ত আমাদেরই করতে হবে।কি করতে পারি বলতো।
সবাই ভেবে বের করলাম স্যারকে নতুন চশমা কিনে দেই।আর তার মেয়ের চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা হাতে তুলে দেই।
কথা অনুযায়ী কাজ শুরু করে দিলাম।ক্লাস থেকে মোট ২৪১টাকা উঠলো।৭০টাকার চশমা কিনে আনলাম কয়েকজন গিয়ে।শনিবারে স্যারেকে আমরা উপহার দেবো।
শনিবার সকালে সবাই স্কুলে তাড়াতাড়ি উপিস্থিত।সবাই মুখে আজ হাসি।স্যারও নিশ্চয় আজ খুব হাসবেন।তার হাসির কি নাম দেবো।শত্রু মুক্ত বন্ধু হাসি।না এটা হবে না।জয় স্যারের জয় জয় হাসি।সবাই বলতেছিও বারবার জয় স্যারের জয় জয় হাসি।আমরা সবাই ভালোবাসি।
জয় জয় আওয়াজ বাহির থেকেও আসছে।আমরা সবাই বাইরে বের হলাম কি হয়েছে জানার জন্য।আওয়াজ স্কুলের ভিতরে না।গেটের বাইরে।এক এক করে ছুটে গেলাম বাইরে।জয় না আমাদের পরাজয়ের দিন আজ।জয় স্যার রাস্তা পার হয়ে স্কুলে প্রবেশের সময় ট্রাক তাকে ধাক্কা মারে।স্যার ছিটকে দূরে পড়ে।মাথা ফেটে ওখানে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।লাশটা আমাদের দিকে করে দিলো একজন।হাসি হাসি মুখ।কিন্তু আমরা তার হাসির নাম দিতে পারলাম না।পারলাম না নতুন চশমা উপহার দিতে।রাজিব কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।তার হাত থেকে চশমাটা তার অজান্তেই পড়ে পাকা রাস্তার উপর।সাথে সাথে দ্বিতীয় চশমাটাও হয়ে যায় 'ভাঙ্গা চশমা'।

No comments:

Post a Comment